August 13, 2020, 4:58 pm

আমার স্মৃতিমাখা হৃদকমল ভাসায় চোখের কোণ — ৮

আমার স্মৃতিমাখা হৃদকমল ভাসায় চোখের কোণ — ৮

Spread the love

—- দুর্গা বেরা (কোলকাতা, ভারত)

এরা আমাকে অনেকেই চেনে, জানে আমার লেখা কবিতাকে। অনুষ্ঠানের ভীড়ে কেউ কেউ হাসি মুখে এগিয়ে এসে বলল-
■ আপা আপনার “বাইশ বছর”(আমার বয়স বাইশ) কবিতা টা আমি অনেক বার শুনছি। বলি হয়ছি আমিটাও আমি অনেক বার শুনছি, শেয়ারও করসি।
★ তাই! অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
■ ধইন‍্যবাদ আমাদের দ‍্যেন ক‍্যেন। ধইন‍্য হইছি আমরা। আমাদের মানে, মেয়েদের যন্ত্রণার কথা লেখছেন। আইচ্ছা আপা, আপনের ঠাকুমা কি আপনেরে ঐ নামে ডাকতেন?
★ কোন নামে?
■ কালনিমি, না কি যেন্ কয়!
অন্য একজন বললেন-
■ আপা হেইডা কি আপনের জীবন কথা? কিন্তু আপনার তো বিইয়া হইছে দ‍্যাখতে পাইতেছি, আপনের মাথায় সিঁন্দুর রইছে।
★ মজা করে মাথা নাড়ালাম।
■ হালার মাইনষের এত্তো সোন্দর মিষ্টি মুহেও, মুন বরেনা।
আগের জন আবারও বললেন-
■ আপা আপনার ঠাকুমা আপনেরে ঐ নামে ডাকত‍্যেন?
★ আমার ঠাকুমা নেই। শুনেছি আমার জন্মের আগেই, মানে আমার বাবা যখন খুব ছোট, তখন আমার ঠাকুমা মারা গেছেন।
■ তাইলে যে ল‍্যাকছেন?
★ ওটা যে কোন কালো মেয়ের জীবনে হতে পারে।
পাশ থেকে একজন বলে উঠলেন-” আপনি ঠিক কইছেন আপা। আমার জীবনটাও ঐ রকম। তাইতো আপনার কবিতা শুনে আমি কাঁদছি কত। শেয়ার করছি।

বাস যখন ঢাকা পৌঁছল তখন রাত্রি সারে দশটা। এবার শুরু হল হোটেল খোঁজার তাড়না। হোটেল খুঁজে পেতে পেতে রাত দেড়দা বাজল। তখন আর কোনো রেস্টুরেন্টে খাবার পাব ভাবিনি, কিন্তু পেলাম।থাকার হোটেলের মালিকই হোটেলের ছেলেকে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন সেই খাবার-হোটেলে। রুই মাছের ঝাল ও ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়ে যে যার হোটেলের রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালে রুম চেঞ্জ করলাম। ঐ হোটেলেরই রাস্তার ধারের রুমটা নিলাম। ঐ রুমটা তুলনামূলক ভালো বলেই। সকালে স্নান সেরে টিফিন করে ফকিরাপুল ‘আসার হোটেল’ থেকে সি,এন,জি ধরে রওনা দিলাম সাতারকুল। সকাল নটায় একটি হাইস্কুলে ২১শে ফেব্রুয়ারি’র ভাষা-দিবসের অনুষ্ঠানে যেতে হবে। স্কুলের নাম সাতারকুল স্কুল এন্ড কলেজ। প্রতিবাদী কবি জাইদুল ইসলামের আমন্ত্রণে, উনি এই স্কুলের ইংরেজী শিক্ষক।
আমরা রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম, সকাল আটটায়। স্কুলে যখন পৌঁছলাম, তখন ঘরিতে সকাল ন টা।

প্রথমেই আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হল দোতলায় টিচার্স রুমে, তারপর ওখানে জাইদুলভাইএর সাথে আলাপ হল এবং উনি প্রত‍্যেকটি টিচারের সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিলেন। ওখান থেকে আমাদেরকে সাদরে নিয়ে গেলেন প্রধান শিক্ষক মহাশয়ের কক্ষে, আপ‍্যায়ণে চা এবং প্রাতরাশ খেয়ে আমরা নিচে স্কুলের মাঠে গেলাম। সেখানে তখন ছোট ছোট প্রাণের মেলা, বা বলা যায় ফুলের মেলা। একুশের শোভাযাত্রা সেরে সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা রা সকলেই হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে মাঠে জমায়েত হয়েছে এবং সমবেত সঙ্গীত গাইছেন, সেই কালজয়ী গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”। এই সকালে মনটা যেন আনন্দে ভরে গেল। ডাকলেন অনুষ্ঠান মঞ্চে, শহীদ বেদিতে ফুলের তোড়া দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেলাম। এমন মহান সুযোগ কেউ ছাড়ে? যা কিনা ভাষা-শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো। আমিও ছাড়লাম না। আমরা প্রত‍্যেকে অর্থাৎ আমি, আমার বন্ধু, রূপম, পলাশদা, সকলেই পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানালাম। কী যে গর্ব অনুভব হচ্ছিল! তারপর সঞ্চালক মহাশয় আমার হাতে মাইক্রোফোন তুলে দিলেন, বললেন দিদি কিছু বলুন। আমি আমার বক্তব্য রাখার পর একটি স্বরোচিত কবিতা পাঠ করে শোনালাম। অবশ্যই সেটি ভাষা আন্দোলন কে নিয়ে লেখা। তারপর আবার আমাদের কে উপরে নিয়ে যাওয়া হল। স্কুলের ঐ অনুষ্ঠানে একজন দিদিমণির গাওয়া গান। আজও মনে পড়ে তার অনবদ্য সঙ্গীত পরিবেশন। মনে পড়ে ছোট ছোট ছাত্রীদের গণসঙ্গীত ও একজন ছাত্রের কবিতা আবৃত্তি। যা আমি আজও ভুলতে পারি না, আজও কানে বাজে। এত মনোমুগ্ধকর অনুষ্ঠানে নিজেকে যেন ধৌত করেছি, সমৃদ্ধ করেছি।

(ক্রমশ…..)


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com