May 30, 2020, 7:11 pm

টঙ্গীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটার আইডি কার্ড না থাকায় ত্রাণ সামগ্রী থেকে বঞ্চিত দিনমুজুর দরিদ্র মানুষের মানবেতর জীবনযাপন

টঙ্গীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটার আইডি কার্ড না থাকায় ত্রাণ সামগ্রী থেকে বঞ্চিত দিনমুজুর দরিদ্র মানুষের মানবেতর জীবনযাপন

Spread the love

মৃণাল চৌধুরী সৈকত, টঙ্গী :
বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনা ভাইরাস আতঙ্কে গত ২৬ মার্চ থেকে সরকারী বে-সরকারী ছুটি ঘোষনার পর থেকে কাজ ও খাদ্যের অভাবে টঙ্গীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে বসবাসরত অসহায় দিন মুজুর দরিদ্র মানুষের পেটে চলছে অনাকাঙ্খিত ও অঘোষিত লক-ডাউন। গরীব ওইসব মানুষগুলো একদিকে করোনা আতঙ্ক আর অন্যদিকে কাজ না পেয়ে নিধারুন ক্ষুধার যন্ত্রনা নিয়ে তাকিয়ে আছে স্থানীয় বিত্তবান, সমাজ সেবক এবং জনপ্রতিনিধিদের মুখের দিকে। কিন্তু টঙ্গীর ভোটার না হওয়ায় ওসব ওয়ার্ডগুলোর নেতা, কর্মী, শিল্পপতি, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ ওইসব দিনমুজুর, রিকশা চালক, ভ্যান চালকসহ দরিদ্র মানুষের প্রতি কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে খেয়ে না খেয়ে স্ত্রী সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করছে নিন্ম আয়ের অধিকাংশ দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা। এমন একাধিক চিত্র উঠে এসেছে টঙ্গীর বিভিন্ন বস্তি এলাকাসহ শ্রমিক অধ্যুষিত পাগাড়, ঝিনুমার্কেট, বিসিক, খাঁপাড়া, গাজীপুরা, সাতাইশ, খরতৈল, মুদাফা, মিরাশপাড়া, টঙ্গীবাজার, দত্তপাড়া, টিএন্ডটি, নতুন বাজার এলাকার শতশত পরিবারের মধ্যে।
গাজীপুর মহানগরীর ছোট-বড় কয়েক শতাধিক বস্তি এলাকা রয়েছে। এরমধ্যে টঙ্গী পূর্ব থানা এলাকায় ১১ এবং টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকায় ১৮টি ছোট বড় বস্তি রয়েছে। এসব বস্তিসহ আশপাশে থাকা দিনমুজুর দরিদ্র মানুষের মাঝে সরকারী ভাবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তা প্রতিনিয়ত পৌঁছালেও পৌছানো হয়নি হ্যান্ড সেনিটাইজার, হ্যান্ড গ্লাবস বা মার্কস কিংবা দেয়া হয়নি কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা। এসব দরিদ্র মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হলেও কাজ আর অর্থের অভাবে তারা কেউই মানতে পারছে না স্বাস্থ্য সুরক্ষার কোন প্রকার নিয়মনীতি। স্থানীয় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসক ও মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে করোনাভাইরাস সচেতনতা বার্তা দিয়ে মাইকিং করা হলেও সচেতনতার ধারে কাছেও নেই এসব বস্তিবাসী বা দরিদ্র দিনমুজুর জনগোষ্টী। বস্তি ও উপরোক্ত এলাকাগুলোতে বসবাসরত দরিদ্র মানুষগুলো কাজের অভাবে অর্থ যোগাতে না পেরে গত কয়েকদিন তাদের ছেলে মেয়ে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অভুক্ত থেকে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
ভুক্তভোগী পাগাড় খ্রিষ্টান পাড়ার বিপুল ডি কস্তার বাড়ির ভাড়াটিয়া রিকশা চালক মো.ওয়ারিছ মিয়া জানান, তার বাড়ি গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া থানা এলাকায়। সে তার পরিবারের ৪ সদস্যকে নিয়ে দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর টঙ্গীতে বসবাস করছেন। রিকশা চালিয়ে সে তার পরিবার নিয়ে কোন মতে দিনাতিপাত করছেন। দেশের এ পরিস্থিতিতে গত ৬ দিন রিকশা চালাতে পারেন না ফলে টাকার অভাবে বাজার করতেও পারেন না। এখানকার ভোটার না হওয়ায় স্থানীয় ভাবে কোন সাহায্য সহযোগীতাও পাচ্ছেন না। ফলে স্ত্রী সন্তান নিয়ে মানবেতর দিন যাপন করছেন। একই অবস্থা পাগাড়ের বাসিন্দা ৪ সদস্য বিশিষ্ট ভ্যান চালক স্বপন মিয়া, ২ সদস্য বিশিষ্ট টেম্পু চালক রাজিব সরকার, ৮ সদস্য বিশিষ্ট নামমাত্র চা দোকানদার চন্দন দাস, ৪ সদস্য বিশিষ্ট টেম্পু চালক মুঞ্জুরুল ইসলাম মুঞ্জু, ৩ সদস্য বিশিষ্ট দিন মুজুর কামাল হোসেন, ৫ সদস্য বিশিষ্ট দিন মুজুর স্বপন সরকারসহ কো-অপারেটিভ ব্যাং মাঠ বস্তির বাসিন্দা বৃদ্ধ সিরাজ মিয়ার পরিবার। জানা যায় ওই এলাকায় প্রায় দেড় থেকে দুশত পরিবার রয়েছে যারা এ এলঅকার ভোটার নয়। ফলে কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা পাচ্ছে না তারা।
অপদিকে বস্তিগুলোতে অ-স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বহুলোক একত্রে বসবাস করেন। তাদের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশী। আর তাই স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা দিনে কয়েকবার করে এসে তাদের বুঝিয়ে যাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কাজ ও অর্থাভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতে না পেরে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। ফলে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। তবুও কোন কাজ মিলছে না কোথাও। এসব বস্তিবাসীদের বাঁচিয়ে রাখতে এবং তাদের সাহায্য সহযোগীতায় স্থানীয় বিত্তবান, সমাজ সেবক এবং জনপ্রতিনিধিদের দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে আসা জরুরী। বস্তিগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, সচেতনতা বৃদ্ধিতে যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণার কার্যক্রম রয়েছে। কিন্তু নেই তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার তেমন কোন ব্যবস্থা। বস্তির বাসিন্দা এবং ওইসব এলাকায় স্বাস্থ্য সেবায় আলাদা কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র হয়নি। যে যেভাবে পারছে চলাফেরা করছে, শিশুরা অবাধে খেলাধুলা করছে। বাচ্চাদের ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে না। অর্থের অভাবে যেখানে খাদ্য সামগ্রী ক্রয় করতে পারছে না সেখানে জীবাণুমুক্ত থাকার জন্য সাবান, হ্যান্ড সেনিটাইজার, হ্যান্ড গ্লাবস বা মার্কস ব্যবহার করবেন কি করে ?
টঙ্গীর কড়ইতলা বস্তির মাহামুদ বেলা নামে এক ব্যক্তি তার ফেইসবুক পেইজে লিখেছেন, “কড়ইতলা বস্তিতে ছিন্নমূল ৪০টি পরিবার খাদ্য সংকটে আছে, এলাকার বিত্তবান লোকদের এগিয়ে আসার আহবান জানাই” তিনি আরো লিখেছেন “করোনার কারণে অসহায় গরিব মানুষের পেটে লকডাউন” আসে নাই এমপি, আসে নাই মেয়র মহোদয়, আসে নাই এলাকার বড় কোন নেতা,রাজনীতি না করে-সত্যিকারের মানুষ হোন, ছিন্নমূল বস্তিবাসী মানুষের খবর নিন, তারা কেমন আছে, নিন্ম আয়ের মানুষের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন ”।
জানা যায়, টঙ্গীর আমতলী, কেরানীর টেক, রুবেল সরকারের বস্তি, কো-অপারেটিভ ব্যাংক মাঠ বস্তি, রেলওয়ে কলোনী বস্তি, এরশাদনগর বস্তি, ভরান মাজার বস্তি, তুরাগ পাড়ে বাইদ্যা বহর বস্তি, চানকিরটেক বস্তি, নামাপাড়া বস্তি, কলাবাগান বস্তি, লাল মসজিদ বস্তি, জেরিন-জিন্নাত বস্তিসহ প্রায় প্রতিটি বস্তির একই চিত্র বিরাজ করছে দিন মুজুর দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনে। টঙ্গী এলাকার ভোটার না হওয়ায় তাদের দূর্ভোগের অন্ত নেই। যদিও ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, স্থানীয় কাউন্সিলর ব্যক্তি উদ্যেগে ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে পাড়া, মহল্লা বা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিতরণ করছেন। ওইসব ত্রান সামগ্রী সকল দরিদ্র নিম্ম আয়ের মানুষের মানুষের মাঝে সম-বন্টনের জন্য জোড় দাবী জানান ওইসব দরিদ্র মানুষগুলো।
টেম্পু চালক মুঞ্জুরুল ইসলাম মুঞ্জু জানান, আমাদের নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও কিশোরগঞ্জ এলাকার কয়েকশ পরিবারের সদস্য পাগাড়, ঝিনুমার্কেট এবং ফকির মার্কেট এলাকায় ঘর ভাড়া করে বসবাস করে। এসব মানুষ তাদের স্ব-স্ব এলাকার ভোটার হওয়ার কারণে এবং টঙ্গীর ভোটার না হওয়ার অজুহাতে কোন প্রকার সাহায্য সহযোগীতা তারা পাচ্ছেন না। এদের অধিকাংশ বাসিন্দাই গরিব ও অশিক্ষিতি। তাদের কেউ সিএনজি অটোরিকশা চালক, কেউ রিকশা চালক, কেউ বা সিকিউরিটি গার্ড, দিনমজুর বা পোশাক শ্রমিক।
এব্যাপারে গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস. এম তরিকুল ইসলাম জানান, সরকারী ভাবে আসা ত্রান সামগ্রী দেশের নাগরিকদের জন্য। তারা যে এলাকার ভোটার-ই হোক না কেনো এদেশের নাগরিক তাই অবশ্যই তাদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তাছাড়া অন্যান্য যারা সাহায্য সহযোগীতা করছেন তারাও সময়মত নিশ্চয়ই দেবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com