শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ০৩:৪৬ অপরাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম
যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু সাড়ে ৬ হাজার ছাড়াল মৃত্যুপুরী ইতালিতে আজও ৭৬৬ প্রাণহানি শুধু নিউইয়র্কেই একদিনে ৫৬২ মৃত্যু দিল্লির তাবলিগ জামাত থেকে দুইদিনে ৬৪৭ জন আক্রান্ত বেলজিয়ামে প্রথম ৩ বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত ব্রিটেনে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৬৮৪ জনের প্রাণ কাড়ল করোনা মমতা জাদুতে পশ্চিমবঙ্গে মৃতের সংখ্যা কমল? পুলিশের এক মাসের রেশন পাচ্ছেন গাজীপুরের হতদরিদ্ররা ৬০ হাজার পরিবারকে খাবার দিলেন গাজীপুর সিটি মেয়র গভীর রাতে ঘরে ঘরে খাবার পৌঁছে দিলেন প্রতিমন্ত্রী রাসেল ৯টি ট্রাকে করে বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিলেন সাবেক এমপি ইতালিফেরত বোনের বাড়ি থেকে ফিরে জ্বর-কাশি, বাড়ি লকডাউন শেরপুরে করোনা প্রতিরোধে মোবাইল কোর্টের অভিযানে ২৪ টি মামলায় ৪৬,৫০০ টাকা অর্থদন্ড রাতে দুই কিলোমিটার হেঁটে দরিদ্রদের জন্য খাবার নিয়ে গেলেন ইউএনও আকাশ থেকে খুলে বাড়ির ওপর পড়ল হেলিকপ্টারের দরজা করোনা প্রণোদনায় উপেক্ষিত স্থানীয় উদ্যোক্তারা শ্রমিকের বেতন দিতে বিনা সুদে ঋণ পাবে রফতানি প্রতিষ্ঠান করোনায় পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পে ক্ষতি দুই হাজার ৬২ কোটি টাকা পোশাকশিল্পে ৩ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল সন্ধ্যা পর্যন্ত তিন গ্রুপে মোবাইলে স্বাস্থ্যসেবা দেবে ড্যাব
শ্রমিক-কর্মচারীদের মানবেতর জীবন যাপন রাষ্ট্রায়ত্ব “বাংলাদেশ সোর্ড বেস্নড” ফ্যাক্টরির বাজার ভারতীয় কোম্পানীর দখলে

শ্রমিক-কর্মচারীদের মানবেতর জীবন যাপন রাষ্ট্রায়ত্ব “বাংলাদেশ সোর্ড বেস্নড” ফ্যাক্টরির বাজার ভারতীয় কোম্পানীর দখলে

Spread the love

মৃণাল চৌধুরী সৈকত
কার্যাদেশ বর্হিভূতভাবে ভারতীয় কোম্পানী থেকে নিম্মমানের কাঁচামাল আমদানী করায় দীর্ঘদিনের বাজার হারিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ব কোম্পানী “বাংলাদেশ বেস্নড ফ্যাক্টরি লিঃ”। সম্প্রতি নিম্মমানের কাঁচামাল দিয়ে উৎপাদিত পণ্য ‘সোর্ড বেস্নড’ বাজার থেকে ফেরত আসছে। ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় সৌজন্য হিসেবে দেওয়া বেস্নড ও ফেরত দিচ্ছে ক্রেতারা। এই সুযোগে ভারতীয় কয়েকটি বেস্নড কোম্পানী একচেটিয়া বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিয়েছে বলে। সুকৌশলে ভারতীয় কয়েকটি কোম্পানীকে বাংলাদেশের বাজার পাইয়ে দিতেই রাষ্ট্রায়ত্ব কোম্পানীটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে বলে কারখানাটির শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায়ও এব্যাপারে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে বলে জানা গেছে। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে যিনি জড়িত তাকেই কারখানার আধুনিকায়ন প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে কারখানটির উৎপাদন বিভাগের চাহিদাপত্রের আলোকে ২০ মে: টন স্ট্রীপস ক্রয়ের জন্য আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হয়। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী তিনটি দরদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারতীয় জিন্দাল স্টেইনলেস লিঃ এর পক্ষে তাদের বাংলাদেশী এজেন্ট বিজনী কম লিমিটেডকে সর্বনিম্ম দরদাতা হিসেবে স্ট্রীপস সরবরাহের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। উক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কারখানার বাণিজ্য বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী সহিদুল ইসলামের সাথে যোগসাজশ করে কার্যাদেশে বর্ণিত ০.১০ এমএম পুরত্বের স্ট্রীপসের পরিবর্তে ০.০৯ এমএম পুরত্বের স্টীপস সরবরাহ করে। গত ২৭ জানুয়ারি-২০১৯ ইং ১০.৭৩৫ মে:টন (এমআরআর নং-৮৪৩৫) এবং গত ৩০ জুলাই-২০১৯ ইং ৯.২০৫ মে:টন (এমআরআর নং-৮৪৯২) স্টীপস দুই কিস্তিতে সরবরাহ করা হয়। সরবরাহকৃত স্টীপস টেন্ডার সিডিউল ও কার্যাদেশে বর্ণিত পুরত্বের না হওয়া সত্বেও কারখানার ভান্ডারে তা গ্রহণ করা হয়। সরবরাহকৃত এসব স্টীপস কোম্পানীটির নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন ও কম্পোজিশন পরিপন্থী। নিম্মমানের এই স্টীপস মেশিনের সাথে খাপ না খাওয়ায় একদিকে যেমন অপচয় বেড়েছে অপরদিকে বেস্নডের গুনগত মান খারাপ হয়ে কারখানাটির দীর্ঘদিনের বাজার নষ্ট হয়েছে। ভারত থেকে আমদানীকৃত এই স্টীপস উৎপাদন উপযোগী না হওয়ায় কারখানাটির উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৪০ ভাগই অপচয় ঘটেছে বলে তৎসময় নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কম গুরত্বের এই স্টীপস দিয়ে তৈরি বেøড বাজার থেকে ফেরত আসতে শুরু করলে কারখানার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক একক সিদ্ধান্তে বাজার পুনরুদ্ধারের জন্য বেস্নডের মূল্য কমিয়ে দেন। কিন্তু এরপরও বেøডের বাজার পতন ঠেকাতে পারেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বেস্নডের বিক্রি বাড়ানোর নামে কারখানার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইদুর রহমান (বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ে ন্যস্ত) একক সিদ্ধান্তে উচ্চ মূল্যে বেস্নডের লগো সম্বলিত টি শার্ট ও মেলামাইন বাটি ক্রয় করেন। প্রতি পিচ ৫০ টাকার প্রচলিত বাজার দরের টি-শার্ট ক্রয় দেখানো হয়েছে ১০৭ টাকা দরে। এভাবে মার্কেটিং খাতে মোটা অংকের খরচ দেখানো হলেও বেস্নড বিক্রি বাড়েনি, বরং আগের চেয়ে বিক্রয় আরো কমেছে।
{কারখানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে যোগসাজশ করে কার্যাদেশ বর্হিভূতভাবে নিম্মমানের কাঁচামাল সরবরাহ করে ভারতীয় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এতে উৎপাদিত পণ্যের মান খারাপ হওয়ায় বাজার হারায় রাষ্ট্রায়ত্ব ব্র্যান্ড ‘সোর্ড বেস্নড’। এই সুযোগে বাংলাদেশের বাজার দখল করে নেয় বিদ্যুৎ, সুপারমেক্স-সহ ভারতীয় কয়েকটি বেস্নড কোম্পানী। এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে যিনি জড়িতদেরকে-ই ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে কারখানার আধুনিকায়ন (ডিপিপি) প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয়}।
এছাড়াও রাষ্ট্রায়ত্ব কারখানাটি পরিচালনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও আরো ব্যাপক গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কারখানার ১ ও ২ নং গ্রান্ডিং মেশিনের জন্য নিম্মমানের বিয়ারিং ক্রয় করায় একের পর এক গ্রান্ডিং হুইল ও প্রোফাইল গাইড ভেঙ্গে কারখানার আর্থিক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এতে বেস্নডের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে ও গুনগত মান আরো নষ্ট হচ্ছে। এছাড়াও প্রায় ৬২ জন শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তণের পরিবর্তে নিয়মিত বেতন ভাতা না পেয়ে তাদেরকে খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। অপর দিকে গত প্রায় ১০ বছর যাবৎ ৭ জন শ্রমিক উক্ত প্রতিষ্ঠানে ডেইলী বেসিকে চাকুরি করে আসলেও তাদের স্থায়ী করা হচ্ছে না এমনকি গত প্রায় ৪ মাস বেতন ভাতা পরিশেঅধ করা হচ্ছে না রহস্যজনক কারণে। ভূক্তভোগী শ্রমিকরা আরো জানায়, সরকারী নিয়ম অনুযায়ী কারখানার শ্রমিক কর্মচারীরা দুপুরের খাবার কারখানার ক্যান্টিনে স্বল্প মূল্যে করার কথা অথচ কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করে দিয়েছে গত ২ মাস যাবৎ। অপরদিকে কোম্পানীতে নতুন কাজের টেন্ডার দেয়া হলেও সেই টেন্ডার মোতাবেক কাজ করা হচ্ছে না। প্রকল্প কাজে চলছে অনিয়ম ও দূর্নীতি। প্রকল্পের টাকা লুটপাট করার সাথে জড়িত রয়েছে উক্ত প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
কোম্পাানীর পণ্যের মান ও উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে কারখানা আধুনিকায়নের জন্য গৃহীত ডিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়ম করা হচ্ছে বলেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। জাপান অথবা জার্মান হতে প্রয়োজনীয় মেশিনারি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ডিপিপি প্রকল্পে নির্দেশিত দরপত্র আহ্বার না করে পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। পঁচিশ কোটি টাকা ব্যায়ে কারখানাটি আধুনিকায়নের এই প্রকল্পের পরিচালক নিযুক্ত করা হয়েছে আলোচিত নিম্মমানের স্ট্রীপস ক্রয়ের সাথে জড়িত কর্মকর্তাকে। জানা গেছে, কার্যাদেশ দেওয়ার প্রায় আড়াই মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও কারখানার আধুনিকায়ন প্রকল্পের দৃশ্যত কোন অগ্রগতি ছিলোনা। কারখানার বাণিজ্য বিভাগীয় প্রধান ও প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সহিদুল ইসলাম জানান, চার মাসের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে গত ১৭ অক্টোবর-২০১৯ কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরে পুরনো মেশিনপত্র মেরামত ও নতুন মেশিনপত্র সরবরাহের বিষয়টি সম্পন্ন করা হয়। কারখানার উৎপাদন বিভাগের মতামত ও কার্যাদেশ বর্হিভূতভাবে নিম্মমানের স্টীপস ক্রয়ে জড়িত বাণিজ্য বিভাগীয় প্রধান সহিদুল ইসলাম বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া ও বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেকই টেন্ডার সিডিউল ও কার্যাদেশ পরিবর্তন করে আলোচিত স্টীপস ক্রয় অনুমোদন করা হয়, এতে কোন দূর্নীতি হয়নি বলে তিনি দাবী করেন। কম গুরত্বের এই স্টীপসের কারণে পণ্যের মান খারাপ হয়নি বরং ভাল হয়েছে দাবী করে তিনি বলেন, পুরনো মেশিনপত্রের কারণে বেস্নডের মান খরাপ হয়েছে। নিম্মমানের স্টীপসের কারণে বাজার পতন হয়নি এমন দাবী করে তিনি বলেন, আগে ডিলারদের ৮% ইনসেনটিভ (প্রণোদনা) দিতেন। পরবর্তীতে তা কমিয়ে ৫% পুন:নির্ধারণ করায় বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। তবে তারা আগের অবস্থানে ফিরে গিয়ে বাজার পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন বলে দাবী করেন।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস.এম নাইমুল হাসান কম গুরত্বের স্টীপসের কারণে বেস্নডের গুনগত মান খারাপ হওয়ায় বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়েছে স্বীকার করে বলেন, বাজারে প্রচলিত অন্যান্য ব্র্যান্ডের বেস্নড প্লাটিনাম কুটেড (একধরণের স্বচ্ছ আস্তরণ বিশিষ্ট)। অপরদিকে আমাদের বেস্নড প্লাটিনাম কুটেড না হওয়ায় এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। অন্যদিকে ভারতীয় ও চীনা বেস্নড এক টাকায় আমাদের দেশে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। নিম্মমানের স্টীপস ছাড়াও এসব কারণেও আমাদের বাজার হারাতে হচ্ছে। তবে প্লাটিনাম কুটিং সমৃদ্ধ মেশিন স্থাপনসহ কারখানার আধুনিকায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই সমস্যা আর থাকবে না বলে তিনি দাবী করেন।
এদিকে কারখানার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা অন্য বেস্নড কোম্পানী থেকে সুযোগ সুবিধা নিয়ে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এবং সুকৌশলে রাষ্ট্রায়ত্ব সোর্ড বেস্নডের বাজার ধ্বংস করে দিয়েছেন বলে শ্রমিক কর্মচারীরা অভিযোগ করেন। কারখানার শ্রমিক-কর্মচারি ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি মো. শাহ আলম আক্ষেপ করে বলেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অন্যত্র বদলি হয়ে গেছে, কিন্তু আমাদের কি হলো (!), আমাদের তো কোথাও বদলি হওয়ার সুযোগ নেই। আমাদেরকে এখানেই থাকতে হবে, এখানেই মরতে হবে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা অন্য কোম্পানীর কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে কারখানা ধ্বংস করে আমাদেরকে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি জানান, কারখানায় এই কৃত্রিম দৈন্যতার ফলে মজুরি কমিশন ঘোষিত গত দুই অর্থ বছরের এরিয়া বিল শ্রমিকদের পরিশোধ করা হয়নি। এমনকি তাদের বেতন ভাতাও নিয়মিত পরিশোধ করা হচ্ছে না। বর্তমানে দ্বার দেনা করে লোকসানে কারখানা পরিচালনা করায় তারা চরম অনিশ্চিয়তার মধ্যে রয়েছেন। নিয়মিত বেতন ভাতা না পাওয়ায় শ্রমিক-কর্মচারীরা অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এর আগেও করপোরেশন থেকে টাকা এনে একাধিকবার শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ভাতা পরিশোধ করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com