বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ১০:১৯ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরনাম
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব উদ্বেগজনক বিদ্যুতে দক্ষিণ কোরীয় বিনিয়োগ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৪ দলের আহ্বান ভারত কী আমাদের জিতিয়ে দিতে পারবে: কাদের বাংলাদেশে স্কাইপ বন্ধ ‘স্কাইপ বন্ধ করে সরকার ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো’ শীতকালীন সবজিচাষে খুশি পঞ্চগড়ের কৃষকরা চলনবিলে নিভু নিভু করছে চাকা তৈরির পেশা নির্ভুল পথেই হাঁটছেন এরশাদ’ ‘পুলিশকে অ্যাকশনে নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল সংঘর্ষের পরিকল্পনাকারীদের’ সেই হেলমেটধারী গ্রেফতার কার্জন হলের সামনে থেকে নবজাতক উদ্ধার ইভিএম নিয়ে সক্রিয় হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নীতিমালার বাইরে গেলে পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন বাতিল: ইসি সচিব হাসপাতালে স্ত্রীর লাশ ফেলে পালালেন স্বামী এরশাদ ঢাকায়, না রংপুরে সিংহভাগ ইসলামী দল ক্ষমতাসীন দলে ‘ঘটনা ঘটলেও তদন্ত কমিটি করেনি ইসি’ দখল ও কারচুপি ঠেকাতে কেন্দ্র পাহারার নির্দেশ
ওয়াশিং দ্য ডার্টি লিনেন ইন পাবলিক

ওয়াশিং দ্য ডার্টি লিনেন ইন পাবলিক

উপ-সম্পাদকীয় : ‘অল ইজ নট ওয়েল ইন দ্য স্টেট অব ডেনমার্ক’–নির্বাচন কমিশন সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য বর্তমান কমিশনের প্রায় শুরু থেকেই অনেকে করে আসছেন। আর এটা হয়েছে কমিশন, বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার মহোদয়ের কিছু কিছু দৃশ্যত অনিশ্চিত পদক্ষেপ, দ্বিধান্বিত কথাবার্তা এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনসমূহে ক্ষেত্রবিশেষে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে অপারগতার কারণে। আমরা তবু এই কমিশনকে একটি ন্যায্য ও নিয়মানুগ সুযোগ দিতে চাই। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ফেয়ার চান্স’। কারণ ক্লাস টেস্ট-হাফ ইয়ার্লি-প্রিটেস্ট ইত্যাদির ‘সিকি-আধুলি’র পর ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে শিগগিরই। তখনই বোঝা যাবে জনগণ নামক পরীক্ষক তাঁদের জিপিএ ৫ দেয় না কী দেয়। তবে এখন যে লেজে-গোবরে অবস্থায় জড়িয়ে যাচ্ছে কমিশন, তাতে কেউ যদি মনে করে তাঁদের ‘ফেলই টেকে না, তার আবার পাশ’ অবস্থা দেখা দিয়েছে, তা হলে কি খুব একটা ভুল হবে? আর অতি সম্প্রতি কমিশন যে কথার চুলোচুলি প্রদর্শন করল, তা দেখে তো দেশবাসীর আক্কেলগুড়ুম হওয়ার দশা।

দেখতে পাচ্ছি কোনো কোনো পাঠক ‘ফেলই টেকে না, তার আবার পাশ’ কথাটার মাজেজা কী জানতে চান। গুরুগম্ভীর আলোচনায় যাওয়ার আগে এই কথাটির পেছনের গল্পটা তা হলে বলে নিই। ওটা ক্ষুধা উদ্রেককারী ‘অ্যাপিটাইযারের’ মত মনে হতে পারে। তা এক রবার্ট ব্রুস মার্কা ছাত্র ক্লাস নাইনে পাঁচবার লাড্ডু মেরে সেবার অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষার ফল জেনে বাড়ি ফিরল বেশ দেরি করে। এদিকে সেই বিকেল থেকে তার আব্বাজান তার প্রতীক্ষায় থেকে থেকে ঘর-বার করছেন। এমন সময় দেখা গেল, তাঁর অকালকুষ্মাণ্ড পুত্রধন বাড়ির খিড়কি দরজা দিয়ে নিশিকুটুম্বের মত চুপি চুপি প্রবেশ করছে। আব্বাহুজুর তার কর্ণাকর্ষণ করে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আসতে আসতে জানতে চাইলেন, ‘কী রে, এবার পাশ করেছিস?’ সেই রবার্ট ব্রুস তার যন্ত্রণাকাতর মুখব্যাদান করে বলল, ‘এ্যাঁ, ফেলই টেকে না তার আবার পাশ!’ রাগে গজগজ করতে করতে পিতা জানতে চাইলেন, ‘সেটা আবার কী?’ পুত্র জবাব দিল, ‘ওরা এবার আমাকে এক ক্লাস নিচে, ক্লাস এইটে, নামিয়ে দিচ্ছিল। সারা দিন হেড স্যারের পায়ে ঝুল্লু খেয়ে পড়ে থেকে কোনোমতে ওটা ঠেকিয়েছি। আর তুমি জানতে চাইছ পাশ করেছি কি না। এ্যাঁ, আহলাদে আর বাঁচি না! পাশ করা কি অত সোজা?’

দুই.

না, পাশ করা অত সোজা না। না কোনো ছাত্রের জন্য, না নির্বাচনে কোনো ভোটপ্রার্থীর জন্য, না নির্বাচন কমিশনের জন্য। হ্যাঁ, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার পরীক্ষায় শুধু ভোটপ্রার্থীই নন, সংশ্লিষ্ট সবাইকেই অবতীর্ণ হতে হয়। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হবে না। আর দিন শেষে পুরো জাতি পরীক্ষকের ভূমিকা পালন শেষে রায় দেবে–পাস, ফেল, না ফেলই টেকে না মার্কা পারফরমেন্স। আর ফেল করে জাতির পা ধরে ঝুলাঝুলি করার মত অসম্মানজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন না হয়ে বরং সসম্মানে যাতে এই পুলসিরাত পার হওয়া যায়, সেই প্রস্তুতি নেওয়াই কি উত্তম নয়? সেই লক্ষ্যে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চেষ্টার ত্রুটি থাকে না কখনো। এবারও তারা ইতিমধ্যেই মাঠ গরম করার মত নানাবিধ তৎপরতায় মেতে উঠেছেন। দলাদলি, কোলাকুলি, ‘জোটাজুটির’ ধুন্ধুমার চলছে চারদিকে। নির্বাচনের আগে এটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু যেটা স্বাভাবিক নয় সেটা হচ্ছে, ফাইনাল পরীক্ষাকে সামনে রেখে হেড মাস্টার মহোদয় ও তাঁর সহকর্মীদের নিজেদের মধ্যে বাদ-বিসংবাদ। তাঁদের মধ্যে অনৈক্যের ঢাক গুড়গুড় তো এখন রীতিমত প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছে। শিক্ষার্থী ও তাদের অগণিত অভিভাবকের মনে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে : এই শিক্ষকমণ্ডলী আসন্ন চূড়ান্ত পরীক্ষাটি কি আদৌ সুষ্ঠুভাবে নিতে পারবেন? তাঁরা কি পক্ষপাতিত্ব দেখিয়ে পল্টুর জায়গায় বল্টুকে অন্যায়ভাবে প্রথম স্থানটি দিয়ে দেবেন? বাইরের ‘চোথা’ সরবরাহকারী ও ছোরা প্রদর্শনকারীদের কি তাঁরা দৃঢ়হস্তে দমন করতে পারবেন? ইত্যাকার নানা দুর্ভাবনা, শঙ্কা-আশঙ্কার জন্ম কিন্তু দিচ্ছেন বাইরের কেউ নন, বিজ্ঞ কমিশন নিজেই।

মতানৈক্য, মতদ্বৈধ, তর্ক-বিতর্ক এগুলো সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনে আছে। এগুলো থাকাটাই স্বাভাবিক। না থাকাটাই বরং অস্বাভাবিক। ভিন্নমত পোষণ না করা বা মতপ্রকাশে বাধা দেওয়া স্বৈরাচারের লক্ষণ। সেটা সম্ভব শুধু হীরক রাজার দেশে। বর্তমান বিশ্বে তা অচল। যুগ যুগ ধরে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা মানুষকে চিন্তার স্বাধীনতা শিক্ষা দিয়েছে, যার ফলে গত কয়েক শতাব্দী ধরে বিশ্ব নানান দিকে চরম উৎকর্ষ লাভ করেছে। ভবিষ্যতে যে পৃথিবী আরও এগিয়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর এটা সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে মধ্যযুগীয় চিন্তার বন্ধ্যাত্বতা থেকে মানবজাতির মুক্তিলাভের কারণে। এখন সব দেশে, সব রাষ্ট্রে, বিভিন্ন সংগঠন পরিচালিত হয় মুক্তচিন্তার বিকাশের মাধ্যমে, পারস্পরিক ভাবের ও মতের আদান-প্রদানের দ্বারা। তা রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে (যেমন পার্লামেন্ট বা ক্যাবিনেট) হোক বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্রীড়াপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন—যা-ই হোক না কেন।

আর একজন কর্তাব্যক্তি বা মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষই যে সব জ্ঞানের আধার হবেন, তা তো নয়। এমনকি রাসুল-পয়গম্বররাও তাঁদের সাহাবাদের কথা শুনতেন, তাঁদের মতামত বিবেচনা করতেন গুরুত্ব সহকারে। অথচ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনেকেই ভিন্নমত সহ্যই করতে পারেন না। নির্বাচন কমিশনের মত কোনো সাংবিধানিক পদে চাকরি না করলেও সারাজীবন ছোট-বড় নানা চাকরিতে দেখেছি সহকর্মী ছোট কর্তা-মধ্যম কর্তা, এমনকি সামান্য একজন কেরানিও অনেক সময় চমৎকার সব আইডিয়া দিতেন, মূল্যবান পরামর্শ বা মতামত দিতেন।

মনে পড়ে গেল আজ থেকে ৪৯ বছর আগের ধন মিয়ার কথা। আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমার (এখন জেলা) মহকুমা প্রশাসক। আমার একজন অত্যন্ত দক্ষ, অতিশয় স্বল্পভাষী, বিনয়ী অফিস সহকারী ছিলেন ধন মিয়া। একদিন তিনি একটি নথিতে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর জন্য একটি চিঠির খসড়া আমার স্বাক্ষরের জন্য পেশ করে যথারীতি দাঁড়িয়ে ছিলেন টেবিলের পাশে। ইংরেজিতে সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা চিঠি। আমি জানতাম, ধন মিয়ার লেখা চিঠিতে কলম ধরার জো ছিল না। ঠিক তা-ই, ওই চিঠির খসড়াও ছিল নির্ভুল। তবু আমি কেরদানি করে ওই ছোট্ট চিঠিটির শেষাংশে নিজ হাতে লেখা দু’টি বাক্য জুড়ে দিলাম। ওতে জেলা প্রশাসকের দপ্তরকে দিলাম একটু খোঁচা। এর কারণও ছিল। যে বিষয়ের ওপর ওই দপ্তরের সঙ্গে চিঠি চালাচালি হচ্ছিল, সে সম্বন্ধে আমাদের মতামত আমরা অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম, তবু হয়ত কোনো বিশেষ মহলের প্ররোচনায় বসের দপ্তর থেকে বারবার চিঠি আসছিল। আমার উষ্মাসূচক মন্তব্য দেখে মৃদুভাষী চল্লিশোর্ধ্ব ধন মিয়া ঠোঁটের কোণে ঈষৎ হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন, ‘স্যার, ডিসি অফিসকে এভাবে লেখা বোধ হয় ঠিক হবে না।’ আমি আমার যৌবনোদ্দীপ্ত ঔদ্ধত্যসহকারে বললাম, ‘না, থাকুক এই বাক্য দু’টি। পেয়েছে কী ডিসির অফিস।’ ফলাফল? সপ্তাহখানেক পর মাননীয় জেলা প্রশাসক জনাব আব্দুস সালাম একটা ডিও (‘ডেমি অফিসিয়াল’, বাংলায় আধা সরকারি) চিঠি লিখে বিষয়টিতে আমি মনোযোগ দিয়েছি দেখে ধন্যবাদ জানালেন। আর তারপর আরেকটি অনুচ্ছেদে আরও দু’টি বাক্য জুড়ে নসিহতমূলক ‘শাল্টু’ দিলেন, ডিসি অফিসের সঙ্গে কীভাবে ‘করেসপন্ডেন্স’ করতে হয় সে ব্যাপারে?…আজ আমার প্রিয় অফিস সহকারী ধন মিয়া ও অত্যন্ত বিচক্ষণ, ধীশক্তিসম্পন্ন ও আরেক স্বল্পভাষী ঊর্ধ্বতন সহকর্মী জনাব আব্দুস সালাম (সাবেক সিএসপি, ১৯৫৯ ব্যাচ) বেঁচে নেই। আল্লাহপাক তাঁদের জান্নাতুল ফিরদৌস নসিব করুন।…তাই বলছিলাম, কোথায় যে কে, কোন জিনিসটা শেখাবেন তা কেউ বলতে পারে না। সবাইকে শুনতে হয়, ভালো না লাগলেও সবার মতামত উপস্থাপন করার সুযোগ দিতে হয়।

তিন.

এবার আসুন সাংবিধানিকভাবে সৃষ্ট একটি অতি উঁচু পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ কর্তার দপ্তরে তাঁরই সভাপতিত্বে গত ১৫ অক্টোবর সোমবার অনুষ্ঠিত একটি সভায় ঢুঁ মেরে আসি। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও কর্তাব্যক্তিটি মাননীয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার। পত্র-পত্রিকা মারফত আমরা জানলাম, ওই সভার এজেন্ডা যথারীতি আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল এবং একজন নির্বাচন কমিশনার জনাব মাহবুব তালুকদার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে নির্ধারিত এজেন্ডার বাইরে পাঁচটি প্রস্তাব আলোচনার জন্য উপস্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই পাঁচটি প্রস্তাবের বিরোধিতা করে অপর তিনজন নির্বাচন কমিশনার ‘একত্রে অভিন্ন চিঠি লিখে পৃথক পৃথক ইউও নোটের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অনুরোধ জানান।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাঁদের সঙ্গে একমত পোষণ করে জনাব তালুকদারকে তাঁর প্রস্তাবসমূহ উপস্থাপন করতে দেননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জনাব মাহবুব তালুকদার একটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত পোষণ করে প্রদত্ত লিখিত নোট) দিয়ে সভা বর্জন করেন। সেই নোটে তিনি উল্লেখ করেন : ‘…মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান প্রদত্ত আমার মৌলিক অধিকার। নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই আমার এই অধিকার খর্ব করতে পারে না।’ এ ব্যাপারে বোধ হয় দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নেই। আর অন্য সব কমিশনার কথা বলতে পারবেন, তিনি পারবেন না, এতে তিনি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের’ প্রশ্নটিও তুলতে পারেন!

এখানে কয়েকটি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন এসে যায়। মাননীয় কমিশনার মাহবুব তালুকদার কি এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে তাঁর পাঁচটি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন? নাকি তাঁর প্রস্তাবগুলো অপ্রাসঙ্গিক? উভয় প্রশ্নের উত্তরই বোধ হয়, না। নির্বাচনসংক্রান্ত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একজন কমিশনার নিশ্চয়ই তাঁর বিচার-বিবেচনামত যে কোনো প্রস্তাব রাখতে পারেন। আলাপ-আলোচনার পর সে প্রস্তাব গৃহীত/সংশোধিত/বাতিল হতে পারে। কিন্তু এ ধরনের প্রস্তাব উত্থাপিত হওয়ার আগেই প্রত্যাখ্যান করা বোধ হয় যুক্তিসঙ্গত নয়। বিশেষ করে প্রস্তাবগুলো যেখানে রাজনৈতিক দলসমূহ ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে কমিশনের পূর্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে আসা সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত বলে প্রস্তাবক দাবি করেছেন। সেগুলোকে পরবর্তী পর্যায়ে মাননীয় নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম অযৌক্তিক এবং সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সাংবাদিকদের বলেছেন। তাঁর বক্তব্য যদি ঠিকও হয়, তবু তা সভায় উত্থাপন করতে না দেওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক হয়েছে? যেখানে প্রস্তাবগুলো নির্বাচনকেন্দ্রিক ও উত্থাপক একজন কমিশনার। যে কোনো সভায়ই আলোচ্যসূচির বাইরেও বিবিধ বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার অবকাশ থাকে। তবে তা সভাপতির সম্মতি সাপেক্ষে। কমিশনার তালুকদার হয়ত ভেবেছিলেন, ‘বিবিধ’ আকারে এগুলো উত্থাপনের সুযোগ তাঁকে দেওয়া নাও হতে পারে। তাই আগেভাগে তিনি লিখিত আকারে তাঁর প্রস্তাবাবলি পেশ করেন, যা সম্ভবত মতামতের জন্য অন্য কমিশনারদের কাছে পাঠানো হয়। মাননীয় কমিশনাররা পৃথক পৃথক ইউও নোটের মাধ্যমে তাঁদের অসম্মতি জানান। কিন্তু সেই ইউও নোটের ভাষা নাকি একই রকম। তার মানে বাকি তিন কমিশনার একজোট হয়ে (জোটের রাজনীতির ঢেউ কি তবে এখানেও লেগেছে!) একটি অবস্থান গ্রহণ করেন। এভাবে একটি সরল স্বাভাবিক বিষয়, আমরা মনে করি, অহেতুক জটিল রূপ ধারণ করে।

মাননীয় কমিশনার তালুকদার তাঁর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে মনে করে তাঁর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান ও ‘ওয়াক আউট’ করার বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। এটা একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি করতেই পারেন। কিন্তু মাননীয় কমিশনার কবিতা খানমের কোন সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে, তিনি কীভাবে সংক্ষুব্ধ হলেন, বোঝা গেল না। তিনি সাংবাদিকদের কাছে অর্থাৎ গণমাধ্যমে কেন সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাঁর মতামত প্রকাশ করতে গেলেন? তাঁর তো কথা বলার কথা, ডিবেটে অংশ নেওয়ার কথা কমিশনের সভায়। তাঁর বক্তব্য নিশ্চয়ই কমিশনের বক্তব্য নয়। কমিশনের বক্তব্য তো দেবেন কমিশনের সচিব অথবা প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্বয়ং। তাঁর বক্তব্য নিয়ে কোনো কথা বলা সমীচীন হবে বলে মনে করি না। বরং তাঁদের ‘তক্কাতক্কি’ তাঁদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক, আমরা ‘লেসার মর্টাল’রা এতে শরিক হলে জল আরও ঘোলা হওয়ার আশঙ্কা। তবে তিনি যে বলেছেন : ‘কী বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ করব? সরকারের সঙ্গে আলাপের প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না’—এখানে আমাদের ‘দুইখান কথা আছে’ (স্বর্গীয় কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা জানিয়ে)। নির্বাচনের আর মাত্র মাস দু’য়েক বাকি। এ সময়ে সরকারের সঙ্গে আলাপের কোনো বিষয় যদি একজন মাননীয় নির্বাচন কমিশনার খুঁজে না পান, তা হলে তো ভারি দুশ্চিন্তার কথা। বলতেই হয়—গড সেভ দ্য কুইন।

চার.

শেষ করব এই বলে যে, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো বিভিন্ন দল, গোষ্ঠী ইত্যাদির মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্ব-কলহ-মতবিরোধ নিরসন করে জাতিকে একটি সুন্দর, সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দেওয়া। সেখানে তাঁরা নিজেরাই যদি নিজেদের মধ্যে কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েন, তাহলে দুষ্ট লোকে তো সেই সরিষা ও ভূত তাড়ানোর প্রবচনটি স্মরণ করিয়ে দেবেই। সেই সঙ্গে তাঁদের নির্বাচনের বাস-ট্রেন-লঞ্চ সবই মিস্ হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। কাজেই কমিশনের বিজ্ঞ-প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ সুধীজনদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ দ্বারা আপনাদের প্রতি আমাদের যে শ্রদ্ধা-ভক্তি, তা বিনষ্ট হতে দেবেন না।

ম্যালা প্রবাদ-প্রবচন কপচিয়েছি আজকের লেখায়। শেষ করি তা হলে সেই প্রায়শ উচ্চারিত ইংরেজি প্রবচনটি দিয়ে, যার উল্লেখ করেছি লেখাটির শিরোনামে : ডোন্ট ওয়াশ ইওর ডার্টি লিনেন ইন পাবলিক। এর আমাদের গ্রামীণ ভার্সন হতে পারে এ রকম : তোমার ময়লা-নোংরা ত্যানা-তুনা, কাঁথা-বালিশ সবার সামনে ধুইতে যেয়ো না।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com