বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরনাম
গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব উদ্বেগজনক বিদ্যুতে দক্ষিণ কোরীয় বিনিয়োগ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৪ দলের আহ্বান ভারত কী আমাদের জিতিয়ে দিতে পারবে: কাদের বাংলাদেশে স্কাইপ বন্ধ ‘স্কাইপ বন্ধ করে সরকার ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো’ শীতকালীন সবজিচাষে খুশি পঞ্চগড়ের কৃষকরা চলনবিলে নিভু নিভু করছে চাকা তৈরির পেশা নির্ভুল পথেই হাঁটছেন এরশাদ’ ‘পুলিশকে অ্যাকশনে নেয়ার উদ্দেশ্য ছিল সংঘর্ষের পরিকল্পনাকারীদের’ সেই হেলমেটধারী গ্রেফতার কার্জন হলের সামনে থেকে নবজাতক উদ্ধার ইভিএম নিয়ে সক্রিয় হচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নীতিমালার বাইরে গেলে পর্যবেক্ষক সংস্থার নিবন্ধন বাতিল: ইসি সচিব হাসপাতালে স্ত্রীর লাশ ফেলে পালালেন স্বামী এরশাদ ঢাকায়, না রংপুরে সিংহভাগ ইসলামী দল ক্ষমতাসীন দলে ‘ঘটনা ঘটলেও তদন্ত কমিটি করেনি ইসি’ দখল ও কারচুপি ঠেকাতে কেন্দ্র পাহারার নির্দেশ
খাশোগি কি সৌদি আরবের রাসপুতিন ছিলেন

খাশোগি কি সৌদি আরবের রাসপুতিন ছিলেন

কোনো কোনো সময় লাখো মানুষ হত্যা বিশ্বকে তেমন কাঁপায় না; যেমন—ইয়েমেনে ও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকানে বর্বর হত্যাকাণ্ড। আবার কোনো কোনো সময় একটিমাত্র হত্যাকাণ্ড সারা বিশ্বে ঝড় তোলে, স্বেচ্ছাতন্ত্রের পতন ঘটায়। সাম্প্রতিক অতীতে এর উদাহরণ ফিলিপাইনে আকিনো হত্যা এবং চলতি মাসের ২ তারিখে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকাণ্ড। আকিনো হত্যা ফিলিপাইনের স্বৈরাচারী শাসক ফার্নান্দো মার্কোসের শোচনীয় পতন ঘটিয়েছিল। খাশোগির হত্যাকাণ্ড হাউস অব সৌদের ভিত্তিমূলে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই কাঁপন থেকে হাউস অব সৌদ ভেঙে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা অনেকে করছে।

ফিলিপাইনের ঘটনা এখন সম্ভবত অনেকের স্মৃতিতে ঝাপসা হয়ে আসছে। তাই সংক্ষেপে আমার পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। ফিলিপাইনে মার্কোস ছিলেন এক মার্কিন তাঁবেদার স্বৈরশাসক। দীর্ঘকাল ধরে তিনি সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশ শাসন করেছিলেন। দেশটিতে শক্তিশালী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ছিল। সেটিও ছিল মার্কোসের ক্ষমতার উৎস।

ফিলিপাইনে ক্রমেই মার্কোসবিরোধী ক্ষোভ এবং দেশটি থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার গণদাবি উত্তাল হয়ে ওঠে। মার্কোসবিরোধী আন্দোলনের নেতা ছিলেন আকিনো। মার্কোসের গুপ্তচর বাহিনীর অত্যাচারে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অবশেষে বিশ্বজনমতের চাপে মার্কোস দেশে একটি নির্বাচন দেন। এই নির্বাচনে মার্কোসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য আকিনো দেশে ফেরার দিন-তারিখ ঘোষণা করেন। সারা ফিলিপাইনের মানুষ আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে। এটি বুঝতে বাকি থাকে না যে নির্বাচনে আকিনোর জয় অনিবার্য।

এটি মার্কোসও বুঝতে পারেন এবং একটি নৃশংস হত্যা-পরিকল্পনা করেন। আকিনোকে বহনকারী প্লেনটি দেশের বিমানঘাঁটিতে অবতরণের পর আকিনো যখন বিমানের সিঁড়ি বেয়ে নামছিলেন তখন তাঁকে মার্কোসের ঘাতক স্কোয়াড গুলি চালিয়ে হত্যা করে। মার্কোস রটিয়েছিলেন আকিনোর কোনো ব্যক্তিগত শত্রু তাঁকে হত্যা করেছে। এই জঘন্য মিথ্যাচার কাউকে গেলানো যায়নি। না ফিলিপাইনের মানুষকে, না বিশ্ববাসীকে। তাঁর বিরুদ্ধে ফিলিপাইনে গণ-অভ্যুত্থান ঘটে। এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন আকিনোর সদ্য বিধবা পত্নী। মিসেস আকিনো। স্বামীর পরিবর্তে তিনি প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে মার্কোসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। মার্কোস ভোটের ফল নিয়ে কারচুপি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এবার সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা বিদ্রোহী হন। মার্কোস মিসেস আকিনোর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।

আকিনো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যার একটা মিল আছে। আকিনো ছিলেন স্বৈরাচারী মার্কোসের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আর খাশোগি ছিলেন সৌদি রাজতন্ত্র ও তার বর্তমান সর্বশক্তিমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সমালোচক। তিনি বহুদিন ধরে বিদেশে আছেন। আমেরিকার ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার কলামিস্ট। তিনি যে সৌদি রাজতন্ত্রের কড়া সমালোচনা করতেন তা-ও নয়, বরং একসময় রাজপরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এর পরও তাঁকে এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো কেন?

শেকসপিয়ার লিখেছেন, ‘ফ্যামিলিয়ারিটি ব্রিডস কনটেম্পট—অতি ঘনিষ্ঠতা ঘৃণারও জন্ম দেয়।’ অনেকের মতে, শুধু ঘৃণা কেন, অতি শত্রুতারও জন্ম দিতে পারে। খাশোগি সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে এতই ঘনিষ্ঠ ছিলেন যে প্রয়াত সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে সফরে যেতেন। পরে তিনি যুবরাজ তাকি আল ফয়সালের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র হন। যুবরাজ ফয়সাল ১৯৭৭ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সৌদি গোয়েন্দা চক্রের প্রধান ছিলেন। আফগানিস্তানে মার্কিন যুদ্ধ চক্রান্তের তিনিও একজন প্রধান আর্কিটেক্ট। এই যুবরাজের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র হিসেবে খাশোগিও এই গোয়েন্দাচক্র ও আফগানিস্তানে যুদ্ধ চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েন।

খাশোগি একসময় রিয়াদ থেকে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকা আল ওয়াতানের সম্পাদক ছিলেন। তখনো রাজপরিবারের তিনি সমর্থক ও বন্ধু। রুশবিরোধী আফগান যুদ্ধের সময় তালেবান আমেরিকার মিত্র এবং সহযোদ্ধা ছিল। এই যুদ্ধের বিবরণ বহির্বিশ্বে পাঠানোর জন্য ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাম্ব নামের এক পশ্চিমা সাংবাদিক (বর্তমানে সানডে টাইমসের চিফ ফরেন করেসপনডেন্ট) তালেবান ও মুজাহিদীনদের যুদ্ধঘাঁটিতে অবাধে ঘুরে বেড়াতেন। তখন খাশোগিও সাংবাদিক পরিচয়ে এই তালেবানের সঙ্গী। ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাম্ব তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন, খাশোগির সঙ্গে ১৯৮০ সালের শেষ দিকে পেশোয়ারে একটি মুজাহিদীন ঘাঁটিতে তাঁর প্রথম আলাপ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে গেরিলা সংগ্রামে রত মুজাহিদীনরা তখন খাশোগির বন্ধু। তাদের যুদ্ধের খবর খাশোগিও পশ্চিমা সংবাদপত্রে পাঠাতেন। খাশোগি সৌদি রাজপরিবারের এত বড় ডিফেন্ডার হয়ে উঠেছিলেন যে তিনি সৌদি গুপ্তচর বাহিনীর প্রধান যুবরাজ তাকির হয়ে সৌদিদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগের জবাব দিতেন। নিউ ইয়র্কের ৯/১১-এর ঘটনার পর তালেবান আমেরিকার সমর্থন হারানোর পরও সৌদিরা ওসামা বিন লাদেন ও তালেবানকে সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠলে খাশোগি দৃঢ়তার সঙ্গে তা অস্বীকার করতেন এবং হাউস অব সৌদের মুখপাত্র হিসেবে তাদের পক্ষে কথা বলতেন।

সৌদি গুপ্তচর বাহিনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করায় তিনি সৌদি রাজপরিবারের অনেক গোপন খবর রাখতেন। অন্যদিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ সহযোগী যুবরাজ তাকির বন্ধু হওয়ায় সাংবাদিক পরিচয়ে মার্কিন সেনা ও মার্কিন গোয়েন্দাদের সঙ্গে সারা আফগানিস্তান ঘুরে বেড়ান। তালেবান ও মুজাহিদীনদের তৎকালীন প্রধান ঘাঁটি পেশোয়ারেও তিনি এসেছিলেন।

জামাল খাশোগি একজন বিতর্কিত সাংবাদিক। সাংবাদিক পরিচয়ের চেয়েও সৌদি রাজাদের উপদেষ্টা ও মুখপাত্র হিসেবে তিনি রাশিয়ার সাবেক জারপরিবারের ঘনিষ্ঠ রাসপুতিনের মতো হয়ে উঠেছিলেন বলে অনেকের ধারণা। এরপর হঠাৎ তাঁর রাসপুতিনের মতোই সৌদি রাজপরিবার থেকে বহিষ্কার, এমনকি দেশ ছেড়ে চলে আসতে হলো কেন? তাঁর এই দুর্ভাগ্যের সূচনা ২০১৫ সালে। এ সময় বাদশাহ সালমান সিংহাসনে বসেন এবং তিনি তাঁর ছোট ছেলে এমবিএস নামে পরিচিত মোহাম্মদ বিন সালমানকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স করেন। এই সালমান দ্রুত তাঁর ক্ষমতার বিস্তার ঘটান। তিনি তাঁর বড় চাচাতো ভাই যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েককে ষড়যন্ত্র করে ক্রাউন প্রিন্সের পদ থেকে তাড়ান এবং পরিবারের অন্য সব প্রিন্সের ক্ষমতা হরণ করেন। নিজে সর্বেসর্বা হয়ে বসেন।

জামাল খাশোগি সম্ভবত রাশিয়ার রাসপুতিনের মতো সৌদি আরবের রাজপরিবারের এই অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কোন্দলে কোনোভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং এমবিএসের বিরাগভাজন হন। কিছুদিনের মধ্যে যুবরাজ সালমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে ৪০০ প্রিন্সকে আটক করেন এবং সৌদি রাজতন্ত্রের বিরোধীদের ওপর কঠোর দমননীতি চালান। সৌদি প্রিন্সদের কাছ থেকে প্রচুর অর্থ আদায় এবং তাঁদের ক্ষমতা হরণের পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। খাশোগিও যুবরাজ সালমানের বিরাগভাজন হন। তাঁকে প্রথম লেখালেখি বন্ধ করতে বলা হয়, তারপর দেশ ছাড়তে তিনি বাধ্য হন।

তিনি প্রথমে ভার্জিনিয়ায় চলে যান। মার্কিন মিডিয়া ও গোয়েন্দাচক্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তো আগে থেকেই ছিল। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টে কলাম লিখতে শুরু করেন। ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাম্বের মতে, খাশোগি কখনো সৌদি রাজাদের কড়া সমালোচনা করেননি, রাজতন্ত্রের পতন চাননি। সৌদি আরবে নারীর অধিকার, মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পক্ষে লিখেছেন। তিনি শুধু একবার প্রিন্স সালমানকে সমালোচনা করে লিখেছেন, তাঁর কার্যকলাপ রাশিয়ার পুতিনের মতো  (acting like putin) এইটুকু সমালোচনার জন্য কেউ এমন নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন? তিনি তাঁর বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত কাগজপত্রের জন্য ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে যাবেন, এটা জেনে রিয়াদ থেকে কিলিং স্কোয়াড পাঠানো হবে এবং তারা দূতাবাসে এক দিনের মধ্যে তাঁকে নৃশংসভাবে হত্যা করে তাঁর দেহ খণ্ড খণ্ড করে গায়েব করে দিয়ে স্বদেশে ফিরে যাবে—এমন বর্বরতা চিন্তা করার বাইরে। একজন শত্রুকেও মানুষ এভাবে হত্যা করে না। খাশোগির সাংবাদিক বন্ধু ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাম্বের ধারণা, এটি ব্যক্তিগত ও পরিবারগত প্রতিহিংসা। তিনি লিখেছেন, ‘Khasshoggi’s real crime was to be an insider.’ তিনি রাজপরিবারের ঘরের লোক ছিলেন। তাদের অনেক হাঁড়ির খবর তিনি জানতেন, বিশেষ করে প্রিন্স সালমান সম্পর্কেও; যা ভবিষ্যতে জানাজানি হলে হাউস অব সৌদ এবং প্রিন্স সালমানের গভীর বিপদাশঙ্কা ছিল।

এই হত্যাকাণ্ডের দায় প্রথমে সৌদি আরব স্বীকার করেনি। কিন্তু তুর্কির গোয়েন্দাদের তৎপরতায় এই দায় তাদের এখন স্বীকার করতে হয়েছে। এই সৌদি সরকার উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে দিয়ে অর্থাৎ প্রিন্স সালমানের কয়েকজন সহযোগী ও গোয়েন্দাপ্রধানকে বরখাস্ত করে প্রিন্স সালমানকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পারবেন কি না, তা এখনই বলা মুশকিল।

এটি ওপেন সিক্রেট, প্রিন্স সালমান আমেরিকার সমর্থনে সৌদি আরবে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন। তাঁকে জনপ্রিয় করার জন্য তাঁকে দিয়ে কিছু সংস্কারের কাজ; যেমন—নারীদের গাড়ি ড্রাইভিংয়ের অধিকার দান, সিনেমাগৃহ খুলে দেওয়া ইত্যাদি করানো হয়েছে। এতে তরুণ সৌদিদের মধ্যে প্রিন্সের জনপ্রিয়তা কিছু বেড়েছিল। কিন্তু এই নিষ্ঠুর সাংবাদিক-হত্যা সারা বিশ্বের সাংবাদিকসমাজকে বিক্ষোভে উত্তাল করেছে। এই একটিমাত্র হত্যাকাণ্ড হাউস অব সৌদের শক্ত ভিত্তিও টলিয়ে দিতে পারে—এটিই অনেকের ধারণা।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 jonotarbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com